ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ শুধু জনজীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না, মানুষের আয়ের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। একদিকে বিদ্যুতের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, অন্যদিকে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় অনেক শ্রমিকের আয় হ্রাস পাচ্ছে। সন্তানদের দেখভালের জন্য অতিরিক্ত খরচ ও ছুটি নেওয়ার চাপও বাড়ছে পরিবারগুলোর ওপর।
চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত ‘ক্লাইমেট অ্যানালিটিক্স’-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহ ও খরার সম্মিলিত প্রভাবে ইউরোপজুড়ে গড় গৃহস্থালি আয় প্রায় ৩ শতাংশ কমে যাচ্ছে। গবেষণায় আরও বলা হয়, বর্তমান বৈশ্বিক নীতি অব্যাহত থাকলে এবং ২১০০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে ইউরোপের প্রতিটি পরিবারের আয় গড়ে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
তবে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা গেলে সম্ভাব্য ক্ষতি কমে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। ক্লাইমেট অ্যানালিটিক্সের জ্যেষ্ঠ জলবায়ু অর্থনীতিবিদ জেসি শ্লেপেন বলেন, তীব্র গরমের সঙ্গে খরা যুক্ত হলে অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিদ্যুতের দামে রেকর্ড
তাপপ্রবাহের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে বিদ্যুতের বাজারে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
রিয়েল-টাইম এনার্জি মার্কেট নিউজওয়্যার ‘মনটেল নিউজ’-এর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বেলজিয়ামে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৮ দশমিক ২৫ ইউরোতে পৌঁছেছে। অথচ সাধারণ সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিদ্যুতের গড় পাইকারি দাম প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৫০ থেকে ১০০ ইউরোর মধ্যে থাকে।
এছাড়া নেদারল্যান্ডসে বিদ্যুতের দাম ৯০২ দশমিক ৪৭ ইউরো, ডেনমার্কে ৭৮৬ দশমিক ৮৩ ইউরো এবং ইউরোপের বৃহত্তম বিদ্যুৎ বাজার জার্মানিতে ৭৪৭ দশমিক ১০ ইউরোতে পৌঁছেছে।
কমছে আয়, বাড়ছে চাপ
বিদ্যুতের বাড়তি খরচের পাশাপাশি আয় কমে যাওয়ার চাপও বাড়ছে ইউরোপীয় পরিবারগুলোর ওপর। তীব্র গরমের কারণে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের কয়েক হাজার স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে অথবা পাঠদানের সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে লেখক ও নারী অধিকারকর্মী জোয়েলি ব্রিয়ারলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, স্কুল বন্ধ থাকায় সন্তানদের দেখাশোনার জন্য মা-বাবাকে অতিরিক্ত সময় দিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মজীবী অভিভাবকদের ছুটি নিতে হচ্ছে, যার মধ্যে কেউ কেউ বিনা বেতনের ছুটিও নিচ্ছেন।
অন্যদিকে খোলা জায়গায় কর্মরত শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তীব্র গরমের কারণে নির্মাণ শ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, পণ্য পরিবহন কর্মী এবং কারখানার শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে তাদের দৈনিক আয়ও হ্রাস পাচ্ছে।
ফ্রান্সের কিছু অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিকেলের দিকে মাঠে কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে বিশেষ করে অভিবাসী শ্রমিকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে ইউরোপের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।