জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার তেলিহার আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের চলাচলের রাস্তা, পুকুরপাড় ও অন্যান্য সরকারি খাস সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, পৈতৃক সম্পত্তির দাবি তুলে রাস্তার ওপর ইটের স্থাপনা নির্মাণ, পুরোনো গাছ কেটে নেওয়া এবং কবরস্থান ও পুরোনো উপাসনাস্থলের জায়গা দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর পৃথক লিখিত আবেদন করে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। ২০২৫ সালে দেওয়া ওই আবেদনের অনুলিপি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
অভিযোগে তেলিহার গ্রামের মো. আশরাফ ফকির, মো. সিরাজুল ইসলাম ফকির ও মো. ওসমান মোল্লার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের পক্ষ থেকে দেওয়া আবেদনে সংশ্লিষ্ট জমিকে সরকারি খাস সম্পত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট দাগ ও খতিয়ানের তথ্য তুলে ধরে জমির বিভিন্ন অংশ পুকুরপাড়, উপাসনাস্থল ও জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রাস্তা সংকুচিত হয়ে দুর্ভোগ
আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি মো. ফজলুর রহমান মোল্লা বলেন, প্রায় ৪০টি ভূমিহীন পরিবার এখানে বসবাস করছে। ২০০০ সাল থেকে তাঁরা এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করছেন। বাসিন্দাদের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট প্রশস্ত রাস্তা দখলের কারণে বর্তমানে সাড়ে চার ফুটের মতো সংকুচিত হয়ে গেছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জায়গাগুলো নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি দাবি করে দখল শুরু করেছেন। রাস্তার ওপর ইটের স্থাপনা নির্মাণ করায় বর্তমানে মানুষ ও যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে পুকুরের মাছের খাবার ও মাছ পরিবহনেও ভোগান্তি হচ্ছে।
আশ্রয়ণের বাসিন্দা বন্যা বলেন, রাস্তা সংকুচিত হওয়ায় ছোট-বড় যানবাহন প্রবেশ করতে চায় না। এতে পুকুরের মাছ ও কৃষিপণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
আরেক বাসিন্দা মুঞ্জুয়ারা অভিযোগ করেন, রাস্তার ওপর স্থাপনা নির্মাণের সময় আশ্রয়ণ প্রকল্পের নারীরা বাধা দিলে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। এমনকি একজন কোদাল দিয়ে তাঁকে আঘাত করার চেষ্টা করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
কবরস্থান ও উপাসনাস্থল নিয়েও অভিযোগ
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা সহিদা বেগম বলেন, তাঁদের পরিবারের কয়েকজনের কবর ওই এলাকায় রয়েছে। কবরগুলো ঘিরে তাঁরা গাছ লাগিয়েছিলেন। বর্তমানে কবরের চিহ্ন নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দাও ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কবরস্থান থাকার কথা জানিয়েছেন। তেলিহার গ্রামের ৮৫-৮৬ বছর বয়সী হাফিজ উদ্দিন দাবি করেন, তাঁর স্মরণশক্তি হওয়ার পর থেকেই ওই জমিকে খাস জমি হিসেবে দেখে আসছেন। সেখানে কবরস্থান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনার স্থানও ছিল বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা লালচান রবিদাসের দাবি, ওই এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি পুরোনো উপাসনাস্থল রয়েছে। বিভিন্ন গ্রামের মানুষ সেখানে মানত ও পূজা করতে আসেন। স্থানীয়রা সেখানে টিনের ছাউনি তৈরি করলেও পরে সেটি ভেঙে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্তদের
তবে দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, তাঁরা তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তিতে স্থাপনা নির্মাণ করছেন। সেখানে কোনো দখলদারির ঘটনা নেই। পুরোনো গাছগুলোও তাঁদের নিজেদের এবং সরকারি কোনো গাছ কাটা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। জমির মালিকানার পক্ষে তাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অভিযুক্ত মো. আশরাফ ফকির ও মো. ওসমান মোল্লাও একই ধরনের দাবি করেছেন।
কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফয়সাল আহমেদ বলেন, “বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে জমির রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। এরপর যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি রেকর্ড, দাগ-খতিয়ান ও সরেজমিন সীমানা যাচাই করে জমির প্রকৃত মালিকানা ও শ্রেণি নির্ধারণ করা হোক। সরকারি জমি দখলের প্রমাণ মিললে তা উদ্ধার এবং আশ্রয়ণ প্রকল্পের চলাচলের রাস্তা, কমিউনিটি ক্লিনিকে যাওয়ার পথ ও জনসাধারণের ব্যবহার্য স্থান দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।