উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা দুই দিনের ভারী বৃষ্টিতে মৌলভীবাজার জেলার নদ-নদী, হাওর ও বিলের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে রাজনগর উপজেলার মনু নদীর তীররক্ষা বাঁধের অন্তত তিন থেকে চারটি স্থানে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের মধ্যে বন্যার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মনু নদীর দুটি এবং ধলাই নদীর একটি পয়েন্টে পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া জুড়ী ও কুশিয়ারা নদীর পানিও বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে।
রাজনগর উপজেলার উজিরপুর, একামধু, কান্দিরকুল ও ভাঙ্গারহাট এলাকায় প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে বাঁধের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। বুধবার সকালে স্থানীয়রা বালুভর্তি বস্তা ফেলে পানি আটকানো ও ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করেন।
একই উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের মেলাগড় (টুপিরমহল) এলাকায় প্রায় ১০০ মিটারজুড়ে বাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ায় লোকালয়ে পানি প্রবেশ শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা স্বেচ্ছাশ্রমের পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের আর্থিক সহায়তায় বালুভর্তি বস্তা ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ডও জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক প্রতিরোধমূলক কাজ শুরু করে। এ সময় নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভাঙনপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন করেন।
উজিরপুর গ্রামের বাসিন্দা জমির উদ্দিন বলেন, ২০২১ সাল থেকে প্রায় ৯৯৬ কোটি টাকার মনু নদী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হলে প্রতিবছর বন্যা ও বাঁধ ভাঙনের আশঙ্কায় থাকতে হতো না।
টেংরা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন জানান, নদীর পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে উজিরপুর এলাকায় বাঁধ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বাঁধ ভেঙে গেলে উজিরপুর ও একামধুসহ আশপাশের গ্রামের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও বীজতলার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
এদিকে কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ও মনুমুখ ইউনিয়নের হামরকোনা, দাউদপুর, ব্রাহ্মণগ্রাম, নতুনবস্তী ও বাহাদুর গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক আনিছুর রহমান জানান, গত দুই দিনে মৌলভীবাজারে ১৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী আরও দুই থেকে তিন দিন ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলেও তিনি জানান।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর এলাকায় এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণ পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তরা নির্মাণকাজে বাধা দিচ্ছেন। এছাড়া মেলাগড় এলাকায় একটি টিনশেড ঘর অপসারণ না করায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিটার অংশে কাজ করা সম্ভব হয়নি, যা বর্তমানে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন ওয়ালীদ বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রদানে বিলম্বের কারণে কিছু স্থানে কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পুরোনো জরাজীর্ণ বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রায় ৯৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে মনু নদীর তীর সংরক্ষণ, ব্লক স্থাপন, গাইডওয়াল নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।